কুরবানিঃ ইবাদত, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্‌বোধন!
দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –
আজিকার এ খুন কুরবানির!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির সেরা আজি!- রহমান কি রুদ্র নন?
ব্যাস! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বত্স” শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্‌বোধন!”
~ কাজী নজরুল ইসলাম 

কুরবানি, আত্মত্যাগ, সত্যের অনুসন্ধান অনুসরণ ও পরীক্ষার সম্মিলন যেখানে সমহিমায় ভাস্বর। পৃথিবীতে মানবজাতির আদি থেকে শুরু এই কুরবানি। মানবজাতির প্রথম পিতা ও উৎসমূল, ইসলামের প্রথম নবী হযরত আদম আ. এর দুই পুত্র, হাবিল ও কাবিলের কুরবানি ছিলো ইসলামের ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। ইসলামের ইতিহাস থেকেই পৃথিবীর ইতিহাসের পত্তন। হাবিল একটি ভেড়া ও কাবিল তার ক্ষেতে উৎপাদিত কিছু শস্য কুরাবানি হিসেবে পেশ করেছিলো। আল্লাহ তা’আলা হাবিলের কুরবানি কবুল করেছিলেন। নবী করীম সা. এর নবুওয়তের যুগের আগ পর্যন্ত কুরবানির নিয়ম ছিলো, পশু জবাই করে এক জায়গায় রাখা হতো। যার কুরবানি কবুল হতো আসমান থেকে আগুন এসে তা পুড়িয়ে ফেলতো। কুরবানির গোশত আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মেহমানদারি স্বরূপ একমাত্র শেষ নবীর উম্মতের জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে, যা রাসূল সা.এর বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতম।

কালের পরিক্রমায় কুরবানি বিশেষত্ব লাভ করে হযরত ইবরাহিম আ.এর কাছে। হযরত ইবরাহিমের কুরবানি ছিলো ইতিহাসের সবচেয়ে মহৎ তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনন্য অসাধারণ কুরবানি। হযরত ইবরাহিমের জীবন ছিলো পরীক্ষার জীবন। পদে পদে নানান বিপদাপদ, আগুনে নিক্ষেপণ, দেশত্যাগ, পরিবার ত্যাগ প্রভৃতি ত্যাগের পরীক্ষায় কেটেছে মুসলিম মিল্লাতের আদর্শ পিতা এই মুরব্বি নবীর জীবন। আর তিনিও আল্লাহ তা’আলার প্রতিটি নির্দেশ বিনা বাক্য ব্যয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন করেছেন। আল্লাহর সামনে সর্বৈব সঁপে দিয়ে নিজেকে মুসলিম ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে বৃদ্ধবয়সের একমাত্র চোখের মণি কিশোর ছেলে ইসমাইলকে কুরবানি করার জন্য প্রস্তুত হলেন। আল্লাহর হুকুমের কথা শুনে মা হাজেরা সন্তুষ্ট। ছেলে ইসমাইল‌ও নিজেকে সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে জবাব দিলো, আল্লাহর যা হুকুম তাই তামিল করুন পিতাজি। পৃথিবীর ইতিহাসে মানবের আত্মত্যাগের ইতিহাস রচিত হলো পিতা-পুত্রের কুরবানির ইতিহাস দিয়ে। পিতা তাঁর কলিজার টুকরাকে আল্লাহর রাহে কুরবানি দিতে যাচ্ছে, পুত্র নিজের জান আল্লাহর রাহে কুরবানি দিতে আনন্দচিত্তে মিনা উপত্যকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! কি বিচিত্র সেই চিত্র! কল্পনা করাও কঠিন। আসমানবাসীরাও দেখছে খোদার এই লীলাখেলা। আত্মত্যাগের এরচে’ মহাপবিত্র উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কি হতে পারে! ভাষা ও ভাষ্যে যার প্রকাশ অসম্ভব।
আল্লাহ তা’আলার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন পিতাপুত্র। ইসমাইলের পরিবর্তে একটি জান্নাতি দুম্বা জবাই হলো। পিতাপুত্র ও ফেরেশতারা আল্লাহু আকবার তাকবিরের ধ্বনিতে মুখরিত করলেন আসমান জমিন।

রাসুলুল্লাহ সা. কে পবিত্র কুরআনের সূরা কাউসারে ঈদের নামায ও কুরবানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কুরবানি হলো হযরত ইবরাহিমের স্মারক। আল্লাহ তা’আলা ইবরাহিম আ. এর কুরবানিকে এমন‌ই মর্যাদা দিয়েছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত সামর্থ্যবান মুসলমানদের উপর কুরবানি ওয়াজিব করে দিয়েছেন। কুরবানির বদলে আর কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। কুরবানি ইসলামের মহত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণার স্মারক, শিআরে ইসলাম। ইখলাস, নিষ্ঠা, খোদাভীতি, ত্যাগ ও তাক‌ওয়া অর্জনের ইবাদত এই কুরবানি। কুরবানির বহু ফযিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সহিহ হাদিসে এসেছে, কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের হিসাবে স‌ওয়াব দান করা হয়। এ ছাড়াও আরো ফযিলতের কথা এসেছে।

পৃথিবীর শুরু থেকেই খুনের নাযরানা তথা রক্ত উৎসর্গ‌ মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। রক্তের বিনিময় ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না। রক্ত প্রবাহের কুরবানি‌ই আল্লাহ তা’আলা কবুল করেছিলেন, যা ছিলো পৃথিবীর প্রথম কুরবানি! মানবের রক্ত সবচেয়ে দামি রক্ত। খোদার সামনে সে রক্ত উৎসর্গ করতে পারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আমল। জানের মায়া ত্যাগ করার মতো, দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করার মতো কুরবানি নেই। সৃষ্টির সবকিছু আল্লাহ তা’আলা মানুষের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন। এবং পশুর রক্ত প্রবাহের অনুমতি ও নির্দেশ দিয়ে জানের প্রতীকী কুরবানির বাস্তবায়ন করতে বলেছেন। এই কুরবানি বাহ্যত পশুর কুরবানি মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটা মানুষের প্রবৃত্তির কুরবানি। ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, মুনাফিকি, ভোগের মানসিকতা ত্যাগের শিক্ষা দেয় এই কুরবানি। জানের বদলে জান, যা আল্লাহর দেওয়া ও তাঁর‌ই মহান হুকুম। তাঁর হুকুমের সামনে দাসত্বের নতশির‌ই হলো মুসলিমের মুসলমানিত্ব। এর বাইরে কিছু নেই। যা আছে তা‌ই মূলতঃ প্রবৃত্তির দাসত্ব। এই প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তির মহাপরীক্ষা হলো কুরবানি।

মহৎ কাজ ও মহৎ ব্যক্তিদের স্মরণে ভাস্কর্য স্থাপন ও পূজা উদযাপন করা হয়। কিন্তু ইসলামের দীক্ষা ভিন্ন। ইসলামের আছে নিজস্ব সভ্যতা, লাইফস্টাইল, আচার ও চর্চা। ইসলাম চিহ্ন-প্রতীক পূজাকে শিরক গণ্য করে তা প্রতিহত করে। কোনো প্রকার পশু বা প্রতীকের দাসত্ব থেকে, চাই তা পূজা রূপে হোক বা প্রণয় রূপে— মানবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে ইসলাম। এমনকি মানুষ কোনো মানুষের খোদারূপী দাসত্বকে অস্বীকার করে ইসলাম। তাই ইবরাহিম আ. তাঁর মহৎকর্মের ভাস্কর্যের বিপরীতে ইসলাম সেই মহৎকর্মের বাস্তব অনুশীলন জীবনে কায়েম করার নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ প্রতীকের পূজা নয়, কুরবানির দীক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাই ইবরাহিমি স্মারক। ভাস্কর্য আর প্রতীকপূজা ভঙ্গুর ও দাসত্ব মনোভাবের প্রতীক।

দুনিয়াতে ন্যায়-ইনসাফ কায়েম করা, সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার দীক্ষা দেয় এই কুরবানি। জানের বদলে জান তেমনি রক্তের প্রবাহ ছাড়া ইনসাফ কায়েম হয় না। ইনসাফের লড়াইয়ে খুন অনিবার্য। চাই তা দুশমনের খুন হোক কিংবা শহীদের তাজা মহৎ খুন। স্মরণ করি সেই স্লোগান, “রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”– এমনি এমনিই তৈয়ার হয়নি। এটাই পৃথিবীর আদি ইতিহাস ও বাস্তবতা। নিজের কলিজার টুকরাকে অথবা নিজের কলিজাকে আল্লাহর রাহে, ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে উৎসর্গ করাই তো কুরবানির শিক্ষা!

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কতোই না সুন্দর লিখেছেন,

“‘শহিদান’দের ঈদ এলো বকরীদ!
অন্তরে চির-নওজোয়ান যে তারই তরে এই ঈদ।
আল্লার রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কোরবান,
নির্লোভ নিরহংকার যারা, যাহারা নিরভিমান,
দানব-দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে,
ফিরদৌস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে,
অসুন্দর ও অত্যাচারীরে বিনাশ করিতে যারা
জন্ম লয়েছে চিরনির্ভীক যৌবন-মাতোয়ারা, –
তাহাদেরই শুধু আছে অধিকার ঈদ্গাহে ময়দানে,
তাহারাই শুধু বকরীদ করে জান মাল কোরবানে।
বিভুতি, ‘মাজেজা’, যাহা পায় সব প্রভু আল্লার রাহে
কোরবানি দিয়ে নির্যাতিতেরে মুক্ত করিতে চাহে।

এরাই মানব-জাতির খাদেম, ইহারাই খাক্‌সার,
এরাই লোভীর সাম্রাজ্যেরে করে দেয় মিসমার!
ইহারাই ‘ফিরোদৌস-আল্লা’র প্রেম-ঘন অধিবাসী
তসবি ও তলোয়ার লয়ে আসি অসুরে যায় বিনাশি।
এরাই শহিদ, প্রাণ লয়ে এরা খেলে ছিনিমিনি খেলা,
ভীরুর বাজারে এরা আনে নিতি নব নওরোজ-মেলা!
প্রাণ-রঙ্গিলা করে ইহারাই ভীতি-ম্লান আত্মায়,
আপনার প্রাণ-প্রদীপ নিভায়ে সবার প্রাণ জাগায়।
কল্পবৃক্ষ পবিত্র ‘জৈতুন’ গাছ যথা থাকে,
এরা সেই আশমান থেকে এসে, সদা তারই ধ্যান রাখে!
এরা আল্লার সৈনিক, এরা ‘জবীহুল্লা’-র সাথি,
এদেরই আত্মত্যাগ যুগে যুগে জ্বালায় আশার বাতি।
ইহারা, সর্বত্যাগী বৈরাগী প্রভু আল্লার রাহে,
ভয় করে নাকো কোনো দুনিয়ার কোনো সে শাহানশাহে।
এরাই কাবার হজের যাত্রী, এদেরই দস্ত চুমি!
কওসর আনে নিঙাড়িয়া রণক্ষেত্রের মরুভূমি!
‘জবীহুল্লা’র দোস্ত ইহারা, এদেরই চরণাঘাতে,
‘আব-জমজম’ প্রবাহিত হয় হৃদয়ের মক্কাতে।
ইব্রাহিমের কাহিনি শুনেছ? ইসমাইলের ত্যাগ?
আল্লারে পাবে মনে কর কোরবানি দিয়ে গরু ছাগ?
আল্লার নামে, ধর্মের নামে, মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানি দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম করি তারে,
ঈদ্গাহে গিয়া তারই সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।

অন্তরে ভোগী, বাইরে যে রোগী, মুসলমান সে নয়,
চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য যে পরিচয়!
লাখো ‘বকরা’র বদলে সে পার হবে না পুলসেরাত
সোনার বলদ ধনসম্পদ দিতে পার খুলে হাত?
কোরান মজিদে আল্লার এই ফরমান দেখো পড়ে,
আল্লার রাহে কোরবানি দাও সোনার বলদ ধরে।
ইব্রাহিমের মতো পুত্রেরে আল্লার রাহে দাও,
নইলে কখনও মুসলিম নও, মিছে শাফায়ৎ চাও!
নির্যাতিতের লাগি পুত্রেরে দাও না শহিদ হতে,
চাকরিতে দিয়া মিছে কথা কও– ‘যাও আল্লার পথে’!

বকরীদি চাঁদ করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানি,
আল্লারে পাওয়া যায় না করিয়া তাঁহার না-ফরমানি!
পিছন হইতে বুকে ছুরি মেরে, গলায় গলায় মেলো,
কোরো না আত্ম-প্রতারণা আর, খেলকা খুলিয়া ফেলো!
কোথায় আমার প্রিয় শহিদল মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ?
এসো ঈদের নামাজ পড়িব, আলাদা আমাদের ময়দান!”

যে বস্তুর চাহিদা ও ব্যায় যতো বেশি, তার উৎপাদন ও বিপণন‌ও ততোধিক। যেখানে গরু নিষিদ্ধ, সেখানে গ্রামে-গঞ্জেও গরু তেমন নজরে পড়ে না যতোটা মহিষ চোখে পড়ে। পশুর রক্ত দেখে যাদের পশুপ্রেম জেগে ওঠে সেইসব ম‌ওসুমি পশুপ্রেমীরাই মুসলমানের রক্তে হোলি খেলায় মেতে ওঠে। মজলুম মুসলিমের তাজা খুন দেখে হাসে পৈশাচিক হাসি, আসলে যা মতাদর্শিক। ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর তাবৎ ধর্মীয়-অধর্মীয় আচার এই কথার সাক্ষী যে, বিশেষ সময়ে পশুপ্রেমের জোয়ার মূলতঃ ইসলাম বিদ্বেষের রাজনীতি। আর গরুপ্রেম আদতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কূট মহড়া। কুরবানি গোশত খাওয়ার বা ভোগের কোনো মচ্ছব নয় কিংবা কুরবানির শিক্ষা কোনো ম‌ওসুমি শিক্ষা নয় যে, কুরবানি না করে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হবে। মহত্ব তো এতেই যে, প্রবৃত্তির রক্ত বহায়ে আত্মত্যাগের অনুশাসন সমাজে বাস্তবায়ন করা হবে। কুরবানিকে ভোগযোগ্য মনে করে তা থেকে সাময়িক নিবৃত্তির ম‌ওসুমি আদিখ্যেতা— ভোগের‌ই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যা থেকে মুক্তির জন্য‌ই মহাপরীক্ষা হলো কুরবানি।

ঈদ ও কুরবানি সামাজিক বন্ধন মজবুত করে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সাম্য, মৈত্রী, ইনসাফ ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার বাস্তব অনুশীলন করায়। কুরবানি শুধু ইতিহাস নয়, ধর্মীয় আচার বা ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়। কুরবানি আবহমান কাল থেকে আমাদের ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যুগে যুগে কুরবানি ছিলো, আছে এবং থাকবেই। ইসলাম শুধু তাওহিদ ও একত্বের দীক্ষা দিয়ে একটু সংস্কার করে দিয়েছে। একত্ব ধারণার ছায়াতলে সমবেত হয়ে ঐক্যের বাস্তবায়ন স্রেফ মামুলি ইবাদত‌ নয়, সমাজে এর বাস্তবায়ন অনেক বড় জরূরি ইবাদত। এই চেতনাই ঐতিহ্য রূপে হাজির হয়েছে। আল্লাহর হুকুম এবং সুন্নাহর নির্দেশমতো মুমিনের প্রতিটি কাজ‌ই ইবাদত।

কুরবানির সাথে সম্পৃক্ত আমাদের অর্থনীতি, গরিব-দুস্থ-নিঃস্ব মানুষের অধিকার। সারা বছর আমিষের দেখা পাওয়া যেখানে সোনার হরিণ, এই কুরবানির উসিলায় তারা একটুখানি খুশি হতে পারেন। এখানেই হলো পরীক্ষা। আল্লাহর কাছে কুরবানির পশুর রক্ত, পশম, গোশত পৌঁছায় না, তবে মানুষের মনোবৃত্তি ও তাক‌ওয়া আল্লাহ পরীক্ষা করেন। ভোগের মায়া ছেড়ে সমাজের সবাইকে সাথে নিয়ে উৎসবে মাতাই প্রকৃত আনন্দ। ইসলামে সম্পদ কুক্ষিগত করা, অনৈতিক বিলাসিতা নিষিদ্ধ। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই সামাজিক দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ ইসলামে নাই। তাই গোশতের বিধান‌ও সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে এবং সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। যারা বিগত বছরের কুরবানির গোশত এ বছর ফ্রীজ থেকে বের করবে তাদের উপর লানত বর্ষিত হোক। তাদের ঈমান নিয়ে সন্দেহ আছে।

আমাদের জীবনপ্রণালি, আমাদের আচারের সাথে জড়িয়ে আছে ইসলামের এই মহাউৎসব। অপরাপর উৎসবের মতো এটি নিছক কোনো উৎসব নয়। প্রেম, ভালোবাসা, মহানুভবতা, আত্মত্যাগ, পরোপকার, আত্মিক ও সামাজিক সম্পর্কবন্ধের মহাযজ্ঞ এই কুরবানি। আমাদের জীবন-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমাদের সংস্কৃতি পৌত্তলিক, চিহ্ন পূজার সংস্কৃতি নয়। মানবতা ও মনুষ্যত্বের দীক্ষায় মহিমান্বিত বাস্তব জীবনে অনুশীলনের সংস্কৃতি। সমাজ বিনির্মাণ, সামাজিক বন্ধনের সংস্কৃতি।
কুরবানি শুধু কুরবানি‌ই নয়, কেবল নামকাওয়াস্তে কোনো উৎসব‌ও নয় বা কেবল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি‌তেই এর সূতো বাঁধা নয়। কুরবানি আমাদের স্বাধীনতার দলিল। প্রকাশ্যে গরু কুরবানি দিয়ে তৎকালীন পূর্ববাংলা, বাংলাদেশের সর্বহারা রায়ত-প্রজাদের উপর বর্ণহিন্দু জমিদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ম‌ওসুমি গরুপ্রেমীদের প্রিয় রেড মাওলানা জমিদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে প্রকাশ্যে কুরবানি ও স্বাধীনতার আওয়াজ তুলেছিলেন। জমিদারি শাসনামলে এ দেশে মুসলমানদের ধর্মপালন ও কুরবানির অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিলো, যেমন কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো জমিজমা ও চাষবাসের অধিকার। বহু কুরবানির বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই কুরবানি ও স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও কুরবানি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যে ইতিহাসকে চেপে রাখতে হাজারো কসরত। অথচ এই কুরবানির বদৌলতেই আজকে আমরা মুক্তস্বাধীন।

আমাদের সমাজ জীবনের নানা বৈচিত্র্যের আচারের মাঝে সমহিমায় ভাস্বর এই মহান ইবাদত। এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ধর্মীয় আচারের বাইরেও এর ভিন্ন পরিচয় উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মজলুম মানুষের প্রতিবাদের জ্বলজ্বলে হাতিয়ার এই কুরবানি। গরু কুরবানির রক্ত মানবের মুক্তির প্রবাহ তৈরি করেছিলো। যে প্রবাহের বাস্তবায়ন আজো প্রাসঙ্গিক এই দক্ষিণ এশিয়ায়। পশুপ্রমের নামে মানুষ হত্যার মচ্ছব ভাঙ্গতে আবারো প্রকাশ্যে গরু কুরবানি জরূরি হয়ে পড়েছে হিন্দুত্ববাদীদের কবলে পড়া দক্ষিণ এশিয়ায়। পশুর ম‌ওসুমি প্রেম নয়, মানবের তরে সর্ব প্রকার পশুর খুন বহায়ে ইনসাফ, ঐক্য ও সামাজিক শৃঙ্খলা কায়েম করাই এখনের মানবিক রাজনীতি।