“নীতি ও ন্যায্যতা” বইয়ের রিভিউ

“নীতি ও ন্যায্যতা” The idea of justice বইটির অনুবাদ।বইটিতে চারটি পর্ব রয়েছে। ন্যায্যতার দাবি, যুক্তিপ্রয়োগের বিভিন্ন রুপ, ন্যায্যতার রসদ, প্রকাশ্য যুক্তিপ্রয়োগও গণতন্ত্র। শেষ পর্বে বিশ্বে গণতন্ত্রের উৎস, প্রয়োগ, সফলতা, ব্যর্থতা, কারণ, সমাধান এসবের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার সাথে ন্যায্যতা সম্পর্কে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন অমর্ত্য সেন। গণতন্ত্রের সূতিকাগার গ্রীসে গণতন্ত্র সফল হয়েছিলো শুধু ভোটের উপর নয়, গণতান্ত্রিক অন্যান্য সুযোগ- সুবিধার ভিত্তিতে। গণতন্ত্রের সফলতা নির্ভর করে জনগণের অধিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যা সঠিক প্রয়োগ করতে পেরেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। ভোটদান যে শেষ কথা নয় সেটা প্রমাণ করতে লেখক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত উত্তর কোরিয়াকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। সংবাদপত্রও গণমাধ্যমের ভূমিকা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কতটুকু প্রয়োজন তার ব্যখ্যায় তুলে ধরেছেন –
অবহেলিত ও সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় গণমাধ্যম স্বাধীনতা একটি মূল্যবান ভূমিকা পালন করে।

১৯৪৩সালের দুর্ভিক্ষের সময় গণমাধ্যমে কি ছাপা হবে কি ছাপা হবে না সে সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা ছিলো। ফলে সেসময়ের সঠিক চিত্র উঠে আসেনি, ফলে বৃটিশ কর্মকর্তাররা ভাবছিলেন বাংলায় দুর্ভিক্ষ হতেই পারে না। কিন্তু এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। গণতন্ত্রের সাথে কর্মনীতির যথাযথ প্রয়োগ করলে গণতন্ত্র সফল হয়, জনগণও ন্যায্যতা পায়।সহনশীলতা ফুটে উঠে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুর অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির অগ্রাধিকারের মাধ্যমে। বিপরীতে গোষ্ঠীগত, হিংসা, সংঙ্কীর্ণতা অকার্যকর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে। এমন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মানবাধিকারকে বেনথাম ব্যঙ্গমূলক ভাষায় বলেছেন – কাগুজে নাকিকান্না। যেসব রাষ্ট্রে জনগণ অধিকার পায় না, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকে না সেখানে মানবাধিকারে স্থান নীতিতেই বন্দি থাকে। সক্ষমতাকে মানবাধিকারের আওতায় আনতে হবে, সেটি যদি মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত না হয় নিয়ে আসতে হবে আর সেটিই প্রকৃত মানবাধিকার। উদাহরণ হিসেবে মেয়েদের ভোটাধিকারের কথা বলা হয়েছে। সক্ষমতার প্রয়োগের ২টি দিক তুলে ধরেছেন লেখক বইটিতে – সুযোগ ও প্রক্রিয়া। কোন ব্যাক্তি যখন কোন কিছু করতে সক্ষম তা নিজের ইচ্ছে থেকে করার সুযোগ অন্যটি চাপিয়ে দেওয়া। এগুলো সুযোগের ২টি দিক আর প্রক্রিয়াটি হলো এমন একটি বিষয় যা ব্যাক্তিকে সুযোগের সীমিত সীমানা পেরিয়ে যেতে সাহায্য করে।

মানুষের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি কিছু কর্তব্য পালন করতে হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। কোন ব্যক্তির সক্ষমতা প্রকাশে কর্তব্যের ভূমিকা রয়েছে। সহানুভূতি মানবাধিকারের একটি অংশ যা সক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে। কোন স্বক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তিপ্রয়োগ করতে হবে আর এই যুক্তিপ্রয়োগ জোরালো করা কর্তব্যের ভিত্তি। যেখানে অত্যাচারিত না হওয়ার অধিকার মেনে নেওয়া হচ্ছে, মানবাধিকার হিসেবে দেখানো হচ্ছে সেখানে স্বক্ষমতা সুরক্ষিত হচ্ছে।
দুর্ভিক্ষ থেকে যেমন সহজ সত্য বুঝা যায় যে খাবারের অভাব রয়েছে সেটা যে কারণেই হোক,তেমনি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দাবি চাওয়ার মধ্যে এটা স্পষ্ট যে ন্যায্যতার অভাব রয়েছে। তাই বিরোধী মতামতগুলো বিবেচনা না করেই উড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে যুক্তিগুলো ব্যাখ্যা করে ন্যায্য দিকে যুক্তিপ্রয়োগের গুরুত্ব রয়েছে বলে আলোকপাত করা হয়েছে । ক্রোধ ও যুক্তিতর্ক এ দুটডর ওপর ভিত্তি করে অন্যায়ের বিরোধিতা গড়ে উঠে। ন্যায্যতার কোন অংশের যথার্থ প্রয়োগ কোন দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় তাই ন্যায্য অধিকার মেনে নেওয়া উচিত।সেজন্য ন্যায্য অধিকার রুপায়নে গুরুত্রারোপ করতে হয়। কিন্তু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সহজ নয় কারণ একটি প্রচলিত প্রথা ভেঙ্গে অন্যকোন প্রথা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন যুক্তি, বিশ্লেষণ, রুপায়নে
ক্রোধ ও যুক্তি প্রয়োগ হয় ২টি বিপরীত পক্ষের।সেক্ষেত্রে আংশিক সফলতাও কম নয়। আর এমন শর্ত নেই যে সম্পূর্ণ হতে হবে। ন্যায্যতায় তুলনামূলক আলোচনার গুরুত্ব রয়েছে। কারণ দিনে দিনে এর পরিধি বৃদ্ধি হচ্ছে। বিশ্ব সম্পর্ক থেকে পাওয়া যুক্তিতর্ক ন্যায্যতার ক্ষেত্রকে যথার্থ রুপ দিবে।

এক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক চুক্তি করা হয়। তবে এর কিছু ধারা সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। তবে যে পৃথিবীতে আদর্শ আচরণের প্রতিষ্ঠা হয় না সেখানে সম্পর্ণ নিখঁত সমাজের প্রতিষ্ঠা দাবি করা যায় না। তবে পার্থক্য ও তুলনামূলক আলোচনা, স্বক্ষমতা প্রতিষ্ঠা, প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। আর এসব ধারণা, তথ্য ও তত্ত্ব ভবিষ্যৎ উত্তরণে সহায়তা করবে।

 

📝 তানিয়া সুলতানা

লেখক ও কলামিস্ট