লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট ও প্রবাসী বাংলাদেশি

লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট ও প্রবাসী বাংলাদেশি

ভাষা যেমন মনোভাব প্রকাশে সহায়তা করে মুদ্রাব্যবস্থাও বিনিময়ের মাধ্যমকে সহজ করেছে। টাকা, ডলার, ইউরো, লিরা, দিনার ইত্যাদি দেশ ভেদে নাম পরিবর্তিত হলেও মুদ্রার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বিনিময়ের মাধ্যম। তবে মানদন্ড নিয়ে রয়েছে জটিলতা। ফলে আমাদের আমদানিতে বেশিমূল্য গুণতে হয়। ডলারকে আদর্শ মাধ্যম ধরে বিনিময় করা হয়। বাংলাদেশে ডলারের যোগানের অন্যতম মাধ্যম বিদেশে রপ্তানিকৃত দ্রব্য ও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। বাংলাদেশের আমদানি বেশি রপ্তানির তুলনায়, তাই বাণিজ্যঘাটতি থাকে। যে ডলারের যোগানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ সমৃদ্ধ থাকে তার অধিকাংশ আসে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ থেকে।জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিটেন্স অর্জিত হয়েছে বিশ্বের অর্থনীতির করুণ পরিস্থিতির মাঝে। ইদকে সামনে রেখে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে ববাংলাদেশের এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া সরকারের হুন্ডি কমাতে রেমিটেন্সের উপর প্রণোদনা দেওয়া হুন্ডি হ্রাস হওয়া অন্যতম কারণ। যার ফলাফল রেমিটেন্সের রিজার্ভ বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের দেড়লক্ষ প্রবাসীর বাস লেবাননে। পূর্বে আরো বেশি ছিলো। দিনদিন লেবাননে এ সংখ্যা কমছে।দুইলাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক ছিলো পর্যটন কেন্দ্রিক আয় হওয়া এ দেশে। দেশটিতে ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের অনেক পর্যটক আসে। করোনার প্রাদুর্ভাব লেবাননে বেশি হওয়ায় দেশটিতে এখন পর্যটক নেই। সৌদিআরবের সাথে লেবাননের বৈরী সম্পর্কের জন্যও গতকয়েক বছর ধরে সংকটে দেশটি। ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে প্রকট আকারে। ডলারের পরিবর্তে দেশের মুদ্রার মূল্যমান ক্রমেই কমছে। কাজের সুবিধা নেই বলে বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক দেশে ফিরতে আগ্রহী। অবৈধভাবে ১৫- ২৫ বছর ধরে বসবাস করছে অনেক বাংলাদেশি। দেশে এলে যে পরিমাণ অর্থ জরিমানা দিয়ে আসতে হবে তা তাদের কাছে নেই। কাজের সুবিধা না থাকায় তারা জরিমানার এ বৃহৎ অঙ্কের অর্থের ব্যবস্থা করতে পারছে না। তাই দীর্ঘদিন ধরেই এসব অবৈধ শ্রমিকদের সরকারিভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দাবি করে আসছিলো। গতবছরের শেষের দিকে এবিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, গত ডিসেম্বরে ৩৮৩জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা পূর্বে জরিমানা মওকুফ করে শুধু ১বছরের জরিমানা(মহিলদের জন্য ২০০ ও পুরুষদের জজন্য ২৬৭ মার্কিন ডলার)ও বিমান টিকিটের বিনিময়ে। ধাপে ধাপে ফেরত আনা হবে, জানুয়ারিতেও দেশে ফিরতে আগ্রহী নিবন্ধনের জন্য লেবাননে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ছিলো ভীড়। লেবাননে কর্মরত বাংলাদেশিরা কাজের সুবিধা পাচ্ছে না, ভালো নেই তা সহজেই বুঝা যায় ফিরতে আগ্রহী লোকদের দেখে। ধীরে ধীরে লেবাননে প্রাবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।

লেবানিজ পাউন্ডের দাম গত কয়েক মাসে ৭০% কমে যাওয়ায় ডলার কিনতে হচ্ছে বেশি দামে । ডলারের সংকটের জন্য সে দেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে অর্থ পাঠাতে পারছে না। ফলে তাদের পরিবার ভুক্তভোগী হচ্ছে অর্থের অভাবে। তাদের ডলারে যে বেতন দেওয়া হতো তা এখন লেবাননের মুদ্রায় দিচ্ছে অনেক কোম্পানী ।

রেমকোর চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি শ্রমিকদের বেতন, আমদানি করা মালামাল ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ডলারে পরিশোধ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রমিকদের বেতন ডলারে পাবে কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে লেবানিজ পাউন্ডে, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের চেয়ে তিনগুণ বেতন কম পাচ্ছে সে দেশের প্রবাসীদের অনেকেই। কারণ আগের চুক্তি অনুযায়ী বেতন দিচ্ছে লেবানিজ পাউন্ডে।

দেশে অর্থও পাঠাতে পারছে না ডলারের সংকটের জন্য। পারিশ্রমিকও পূর্বের চেয়ে কম দিচ্ছে অনেক কোম্পানী।করোনার জন্য অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশটির এক তৃতীয়াংশ লোক বেকার। ফলে লেবাননের দেড়লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশির উপর এর প্রভাব পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই।

শুধু লেবানন নয় পৃথিবীর ১৬৪টি দেশে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে অনেকে দেশে ফিরেছে যাদের পুনরায় ফিরে যেতে পারবে কি না কর্মস্থলে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের ডলারের রিজার্ভ কমবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি সরকারের আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতে ডলার রিজার্ভ ঠিক থাকে, ভালো থাকে দেশের অর্থনীতি।