GIS(জিআইএস)-এক অবিস্মরণীয় ম্যাপিং টুল

GIS(জিআইএস)-এক অবিস্মরণীয় ম্যাপিং টুল - kanggal.com

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই দ্রুত বর্ধনশীল সময়ে পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে সবথেকে বেশি প্রয়োজন হয় প্রযুক্তি পণ্য সহ নানারকম টুল সম্পর্কে আপ-টু-ডেট থাকা ।গত কয়েক দশকে বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষন করে তথ্য অর্গানাইজের অনেক টুল আমাদের মাঝে এসেছে ।এর মধ্যে জিআইএস প্রথম সারীতেই থাকবে । নানাবিধ ব্যবহারের জন্য দিন্ দিন এর গুরুত্ব বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে ।

জিআইএস কি?

Geographic Information System সংক্ষেপে (GIS) হল একটি ভৌগলিক তথ্য ব্যবস্থা। এটি তথ্য সংগ্রহ, পরিচালনা এবং বিশ্লেষণের জন্য গঠিত একটি কাঠামো।  এটির মূল ভূগোল-বিজ্ঞানের হলেও,অনেক ধরণের ডেটা একীভূত করে। জিআইএস স্থানিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে এবং মানচিত্র এবং থ্রিডি দৃশ্যের সাহায্যে তথ্যের স্তরগুলিকে ভিজ্যুয়ালাইজেশনে সংগঠিত করে। এই অনন্য ক্ষমতা দ্বারা জিআইএস ডেটাগুলির জটিল অবস্থাগুলো প্রকাশ করে যেমন প্যাটার্ন, সম্পর্ক এবং পরিস্থিতি-যা ব্যবহারকারীদের আরও স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

জিআইএস প্রযুক্তি স্থানিক ডেটা অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা হোয়াইট হাউস “প্রযুক্তি, নীতি, মান, মানবসম্পদ এবং স্থানিক তথ্য অর্জন, প্রক্রিয়া, বিতরণ, ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিয়াকলাপ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।”

জিআইএস অবস্থান সম্পর্কিত যে কোনও তথ্য ব্যবহার করতে পারে। অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ, ঠিকানা, বা জিপ কোডের মতো অবস্থানটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

উৎপত্তি :

জিআইএস ধারণা বেশ আগের হলেও আধুনিক কালে  ‘Father of GIScience’ বলা হয়ে থাকে ‘মাইকেল ফ্র্যাঙ্ক গুডচাইল্ড’কে। ১৯৯২ সালে ‘মাইকেল ফ্র্যাঙ্ক গুডচাইল্ড’ সর্বপ্রথম ‘GIScience’ পরিভাষাটি উত্থাপন করেন।

এর আগে ১৮৫৪ সালে লন্ডন শহরে ‘কলেরা’ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পরে। তখন ‘জন স্নো’ নামক একজন ব্রিটিশ চিকিৎসক কলেরা আক্রান্ত এলাকার তথ্যচিত্র তুলে ধরেন হাতে আঁকা একটি মানচিত্রের মাধ্যমে (ছবি)। বলা হয়ে থাকে, আধুনিক যুগের ‘জিআইএস’ এর সূত্রপাত এইধরণের স্থানিক বিশ্লেষণী (Spatial Analysis) মানচিত্র থেকেই।GIS(জিআইএস)-এক অবিস্মরণীয় ম্যাপিং টুল - kanggal.com

ছবি : ১৮৫৪ সালে ‘জন স্নো’-এর আঁকা লন্ডনের আংশিক মানচিত্র। কলেরা আক্রান্ত এলাকাসমূহ গাঢ় কালো রঙে চিহ্নিত।

১৯৬৯ সালে ‘Jack এবং Laura Dangermond’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘Environmental Systems Research Institute (ESRI)’। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে হার্ভার্ড গবেষণাগারে প্রাপ্ত কৌশল ও ধারনার উপর ভিত্তি করে। শুরুতে ‘ESRI’ একটি অ-লাভজনক ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা (Land-Use Planning) ভিত্তিক পরামর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাবে কর্মকাণ্ড আরম্ভ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা একটি বাণিজ্যিকভাবে সফল ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

জিআইএসএর বহুমুখী ব্যবহার :

এই পর্যায়ে আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি ম্যাপ ঘিরেই মূলত GIS এর কাজ পরিচালিত হয় ।কিন্তু এর বাইরেও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এটি ব্যবহার করা হয়। জিআইএস ডেটার ব্যবহার ব্যবসায় এবং শিল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে। যদি প্রযুক্তিটি ভালভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং কর্মক্ষেত্রে জিআইএস ডেটার অত্যধিক গুরুত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করব।

1.ম্যাপিং ডেটা  2.টেলিকম এবং নেটওয়ার্ক পরিষেবাদি  3.দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ এবং হট স্পট বিশ্লেষণ 4. নগর পরিকল্পনা    5.পরিবহন পরিকল্পনা  6.পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ Agricultural. কৃষি প্রয়োগসমূহ

9.নেভিগেশন  10. বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনুমান  11. প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা  12. ব্যাংকিং  13.কর প্রদান  14.সমীক্ষা যেমন আদমশুমারি 15.ভূতত্ত্ব  16.সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ   17.পরিকল্পনা ও কমিউনিটি উন্নয়ন  18.দুগ্ধ শিল্প   19.সেচ জল ব্যবস্থাপনা   20.কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা    21.খনিজ তেল এবং গ্যাস উত্তোলন ।এছাড়াও আরও বিভিন্নক্ষত্রে এর ব্যবহার লক্ষ করা যায় ।  যেমন এর সাহায্যে আমরা বাস্তব-বিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলির স্থানিক অবস্থানের মানচিত্র করতে পারি এবং তাদের মধ্যে স্থানিক সম্পর্কগুলোকে কল্পনা করতে পারি।  সমস্যা সমাধান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া উভয় ক্ষেত্রের পাশাপাশি স্থানিক পরিবেশে ডেটা দেখার জন্য জিআইএস টুলহিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে । ভূ-স্থান সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে ১) বৈশিষ্ট্যগুলোর একটির সাপেক্ষে অন্য বৈশিষ্ট্যের অবস্থান ও সম্পর্ক নির্ণয়ে ২) যেখানে সর্বাধিক অথবা অতি অল্প বৈশিষ্ট্য উপস্থিত রয়েছে ৩) প্রদত্ত স্থানে বৈশিষ্ট্যের ঘনত্ব 4) আগ্রহের জায়গার ভিতরে কী ঘটছে (এওআই), (৫) নিকটবর্তী বৈশিষ্ট্য ঘিরে কী ঘটতেছে এবং (৬) এবং কীভাবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে (এবং কোন উপায়ে) ।

বিস্তৃত ক্ষেত্র

হেলথ জিওগ্রাফার ,বর্তমানে করোনাকানীন সময়ে স্বাস্থ্য,পাবলিক হেলথ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখছে । জিপিএস,রিমোট সেন্সসিং,জিপিএস সিস্টেম সাহায্যে কন্টাক্ট ট্রেসিং মাধ্যমে চীন সহ অন্যান্য দেশে মহামারী নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ।এছাড়া ট্রাফিক ফরকাস্টিং এর জন্য ব্যবহার  করা হয় ।

বন কর্মকর্তারা  বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং বিকাশ পরিচালনা করে, জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমির স্বাস্থ্য এবং উত্পাদনশীলতা উন্নত করে। জলবায়ু ডেটা সেন্টার অর্থনীতির সব সেক্টরে জলবায়ু বিশ্লেষণ সরবরাহ করার জন্য বিশ্বের বৃহত্তম `জলবায়ু ডেটা সংরক্ষণাগার `ব্যবহার করে।

জিআইএস ব্যবহার করে অনেকগুলি বিভিন্ন ধরণের তথ্য তুলনা ও বিপরীতে দেখা যায়। সিস্টেমটি জনসংখ্যা, আয় বা শিক্ষার স্তরের মতো জনসাধারণ সম্পর্কে ডেটা থাকে। এটিতে ল্যান্ডস্কেপ সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যেমন স্রোতের অবস্থান, বিভিন্ন ধরণের গাছপালা এবং বিভিন্ন ধরণের মাটি। এর মধ্যে কারখানা, খামার এবং বিদ্যালয়ের সাইট বা ঝড়, ড্রেন, রাস্তা এবং বৈদ্যুতিক বিদ্যুতের লাইন সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে ।

জিআইএস প্রযুক্তির সাহায্যে লোকেরা কীভাবে একটি অপটির সাথে সম্পর্কিত তা আবিষ্কার করতে বিভিন্ন জিনিসের অবস্থানের তুলনা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জিআইএস ব্যবহার করে, একটি একক মানচিত্রে এমন সাইটগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা দূষণ উত্পাদন করে, যেমন কারখানাগুলি এবং জলাভূমি এবং নদীগুলির মতো দূষণের প্রতি সংবেদনশীল এমন সাইটগুলি(জমি)। এই জাতীয় মানচিত্র লোকেদের যেখানে জল সরবরাহের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি তা নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে।

তথ্য সংগ্রহ

জিআইএস অ্যাপ্লিকেশনগুলির মধ্যে হার্ডওয়্যার এবং সফ্টওয়্যার উভয়ই সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই অ্যাপ্লিকেশনগুলির মধ্যে কার্টোগ্রাফিক ডেটা, ফটোগ্রাফিক ডেটা, ডিজিটাল ডেটা বা স্প্রেডশিটে ডেটা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

কার্টোগ্রাফিক তথ্য ইতিমধ্যে মানচিত্রের আকারে রয়েছে এবং এতে নদী, রাস্তা, পাহাড় এবং উপত্যকার অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কার্টোগ্রাফিক তথ্যতে জরিপ ডেটা এবং ম্যাপিংয়ের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা সরাসরি কোনও জিআইএসে প্রবেশ করানো যায়।

ফটোগ্রাফিক ব্যাখ্যা জিআইএসের একটি প্রধান অংশ। ছবির ব্যাখ্যায় এরিয়াল ফটোগ্রাফ বিশ্লেষণ করা এবং উপস্থিত বৈশিষ্ট্যগুলি মূল্যায়ন করা জড়িত।

ডিজিটাল ডেটাও জিআইএস-এ প্রবেশ করা যায়। এই জাতীয় তথ্যের উদাহরণ হ’ল উপগ্রহ দ্বারা সংগৃহীত কম্পিউটার ডেটা যা জমির ব্যবহারের ধরন দেখায় যেমন- খামার, শহর ও বনের অবস্থান।

রিমোট সেন্সিং অন্য একটি সরঞ্জাম সরবরাহ করে যা একটি জিআইএস-এ সংহত হতে পারে। রিমোট সেন্সিংতে উপগ্রহ, বেলুন এবং ড্রোন থেকে সংগৃহীত চিত্রাবলী এবং অন্যান্য ডেটা অন্তর্ভুক্ত।

শেষ অবধি, জিআইএস, জনসংখ্যা ডেমোগ্রাফিকের মতো সারণী বা স্প্রেডশিট ফর্মের ডেটাও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। ডেমোগ্রাফিকগুলির সীমা  বয়স, আয় এবং জাতিগত থেকে সাম্প্রতিক ক্রয় সংক্রান্ত এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিং অগ্রাধিকার পর্যন্ত হতে পারে।

দুটি বড় ধরণের জিআইএস ফাইল ফর্ম্যাট হ’ল রাস্টার এবং ভেক্টর। রাস্টার ফর্ম্যাটগুলি হ’ল সেল বা পিক্সেলের গ্রিড। রাস্টার ফর্ম্যাটগুলি জিআইএস ডেটা সংরক্ষণের জন্য কার্যকর যা পৃথকীকরণ বা উপগ্রহের চিত্রের মতো হয়। ভেক্টর বিন্যাসগুলি বহুভুজ যা পয়েন্টগুলি (নোড বলে) এবং লাইনগুলি ব্যবহার করে। ভেক্টর ফর্ম্যাটগুলি সীমান্ত, যেমন স্কুল, জেলা বা রাস্তাগুলির সাথে জিআইএস ডেটা সংরক্ষণ করার জন্য দরকারী।

একটি বিশ্বের মানচিত্র দেশগুলির সঠিক আকার বা তাদের সঠিক আকৃতিগুলো প্রদর্শন করতে পারে তবে এটি উভয়ই করতে পারে না। জিআইএস মানচিত্র থেকে ডেটা নেয় যা বিভিন্ন অনুমানগুলি ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল এবং সেগুলিকে একত্রিত করে যাতে একটি সাধারণ প্রজেকশন ব্যবহার করে সমস্ত তথ্য প্রদর্শিত হয়।

উদাহরণস্বরূপ, জিআইএস মানচিত্রগুলি মানব-তৈরি বৈশিষ্ট্যগুলি নির্দিষ্ট কোন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলির নিকটবর্তী, যেমন বাড়িগুলি এবং ব্যবসায়গুলি বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে তা প্রদর্শন করতে পারে।

জিআইএস মানচিত্রগুলি সংখ্যা এবং ঘনত্ব সম্পর্কে তথ্য প্রদর্শন করতে ব্যবহার করা যেতে পারে । উদাহরণস্বরূপ, জিআইএস দেখায় যে অঞ্চলের জনসংখ্যার তুলনায় পাড়ায় কতজন চিকিৎসক আছেন।

জিআইএস প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকরা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনও দেখতে পারেন। । অফিসিয়ালদের কোথায় নিয়োগ করা যায় তা নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য একজন পুলিশ সীমান্ত অপরাধের ডেটা পরিবর্তনগুলি অধ্যয়ন করতে পারে।

জিআইএস প্রযুক্তি কখনও কখনও ব্যবহারকারীদের একটি মানচিত্রে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলি সম্পর্কে আরও তথ্য অ্যাক্সেস করার অনুমতি দেয়। সেই জায়গাটি সম্পর্কে জিআইএস-এ সঞ্চিত অন্যান্য তথ্য সন্ধানের জন্য কোনও ব্যক্তি ডিজিটাল মানচিত্রে একটি স্থান নির্দেশ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি স্কুলে কত শিক্ষার্থী নিবন্ধিত রয়েছে, শিক্ষকের পিছু কতজন শিক্ষার্থী রয়েছে বা বিদ্যালয়ের কী স্পোর্টস সুবিধা রয়েছে তা সন্ধান করতে কোনও স্কুলে ক্লিক করতে পারে।

ইঞ্জিনিয়াররা জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা যে ফোনগুলি ব্যবহার করি তার জন্য যোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলির নকশা, বাস্তবায়ন এবং পরিচালনা এবং সেইসাথে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সমর্থন করে। অন্যান্য ইঞ্জিনিয়াররা রাস্তা নেটওয়ার্ক এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করতে জিআইএস ব্যবহার করতে পারে।

বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে GIS

বাংলাদেশে জিআইএস-এর ব্যবহার খুব সাম্প্রতিক হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যে সকল খাতে স্থানিক সম্পর্কিত উপাত্ত, যেমন- জেলা, থানা, অথবা কোনো একটি ভূখন্ডের সীমানার সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য ও বিষয়াদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে সে সকল খাতে জিআইএস প্রযুক্তি অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে, ভূমি ব্যবহার, আদমশুমারি, নগর পরিকল্পনা, বন, পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস উত্তোলন শিল্প, বিভিন্ন সেবাখাত, পরিবহণ ব্যবস্থাসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে জিআইএস প্রযুক্তি আজকাল ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএএস) নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১৯৯৩ সালে তাদের জিআইএস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। বিভিন্ন প্রকল্পে জিআইএস-এর প্রয়োগসহ বিসিএএস বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে জিআইএস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে। নিজস্ব জিআইএস সুবিধা ব্যবহার করে বিসিএএস সফলভাবে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসকল প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সৌরশক্তি পাইলট সমীক্ষা প্রকল্প, ঢাকা শহরের স্বাস্থ্য সুবিধা, এবং বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন: দেশওয়ারি সমীক্ষা।

রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ১৯৯৩ সালে জিআইএস স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে। প্রধানত নগর পরিকল্পনা প্রণয়নে রাজউক জিআইএস সুবিধা প্রয়োগ করে থাকে। বিশেষ করে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে নগর মানচিত্র প্রণয়ন ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় রাজউক জিআইএস কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। জিআইএস প্রযুক্তির সাহায্যে পারিসরিক (spatial data) ও আরোপিত উপাত্ত (attribute data) ব্যবহার করে রাজউক প্রস্ত্ততকৃত মানচিত্রের মধ্যে রয়েছে নগরীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা মানচিত্র এবং অবকাঠামো মানচিত্র। এ মানচিত্রগুলি কৌশলগত ১:৫০০০০ প্রতিভূ অনুপাত থেকে বিস্তৃত ১:৩৯৬০ প্রতিভূ অনুপাতের হয়ে থাকে

সার্ফেস ওয়াটার মডেলিং সেন্টার (Surface Water Modelling Centre- SWMC)-এস.ডব্লিউ.এম.সি উপাত্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ, মডেল তৈরি এবং পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হিসেবে জিআইএস ব্যবহার করে থাকে। জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে এস.ডব্লিউ.এম.সি কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ নির্ণয় এবং শস্যের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন প্রভৃতি কর্মকান্ড সফলভাবে পরিচালনা করছে। জিআইএস ভিত্তিক সফটওয়্যার উৎপাদনেও এরা সফল হয়েছে। ইন্টারেক্টিভ ইনফরমেশন সিস্টেম (আইআইএস) উৎপাদিত সফটওয়্যারগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সফটওয়্যার যেখানে একটি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার আওতায় প্রস্ত্ততকৃত মানচিত্রে ভূসংস্থানিক তথ্যের সঙ্গে নদীখাত, কাঠামো, রাস্তাঘাট, বাঁধ, বাড়িঘর প্রভৃতি সংক্রান্ত তথ্যও সমন্বিতরূপে যৌক্তিক ডাটাবেস ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে (Rational Database Management System-RDMS) সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ২০১৪-১৫ সালে ঢাকা শহরের নিম্নাঞ্চলসমূহের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে কতিপয় প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং নগরীর নিম্নাঞ্চলের জন্য জিআইএস প্রযুক্তিভিত্তিক একটি পাইলট হাইড্রোডিনামিক নিষ্কাশন মডেল তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে, জলাবদ্ধতা নিরসনমূলক বিভিন্ন প্রকল্প মূল্যায়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল এলিভিয়েশন মডেল ‘ডিইএম’ (Digital Elevation Model – DEM) এবং সার্ফেস ওয়াটার মডেলিং সেন্টার কর্তৃক তৈরিকৃত ‘মাউস’ মডেল স্থাপন করা হয়েছে।

সফটওয়্যার

জিআইএস ব্যবহারকারীদের কাছে আর্ক-ইনফো (ArcInfo) এবং আর্ক-ভিউ জিআইএস (ArcView GIS) সফটওয়্যার দুটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। দক্ষ জিআইএস ব্যবহারকারীরা আর্কভিউ এক্সটেনশন টুল নিয়ে কাজ করে থাকেন, বিশেষ করে, ভৌগোলিক উপাত্তের জিআইএস-ভিত্তিক মডেলিং যেমন: পারিসরিক বিশ্লেষণ, ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ (3D Analysis), নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ, ইমেজ বিশ্লেষণে এবং ইন্টারনেট ম্যাপ সার্ভার ইত্যাদি আর্কভিউ এক্সটেনশন টুল ব্যবহার করে থাকেন। জিআইএস এর অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যারগুলি হচ্ছে: ইরদাস (ERDAS), ইরদাস ইমাজিন (ERDAS IMAGINE), ইদ্রিসি (IDRISI), টসকা (Tosca), ই.আর ম্যাপার (ER Mapper), স্পানস (SPANS), ম্যাপ-ইনফো (MapInfo), ম্যাপ-বেসিক (MapBasic), ইম্যাজিন (Imagine), আর্থ-ভিউ (Earth View), সার্ফার (Surfer), ল্যান্টাস্টিক নেটওয়ার্ক (Lantastic Network), অটোক্যাড (AutoCAD), আর্ক-এফ.এম (ArcFM), আর্ক-ম্যাপ (ArcMap), ম্যাপ-অবজেক্টস (Map Objects), আর্ক-অবজেক্টস (Arc Objects) এবং আর্ক-জিআইএস (ArcGIS)। উল্লিখিত সবগুলি জিআইএস সফটওয়্যার ডস (DOS), উইন্ডোজ (Windows) এবং ইউনিক্স (Unix) ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমে সচল হয়।

চাকুরীর ক্ষেত্র :

GIS স্পেশালিস্ট সাধারণত সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতে গবেষণা ও সার্ভের কাজে নিযুক্ত থাকেন। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি খাত, স্থাপত্য ও আবাসন, পরিকল্পনা, জ্বালানী খাত, স্বাস্থ্য সেবা, ইন্ডাস্ট্রি কাঁচামাল, টেলিকমিউনিকেশন, ইউটিলিটি, বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষিখাত, এনজিও, জরিপ, ম্যাপিং সেক্টর GIS স্পেশালিষ্ট এর মূল কাজের ক্ষেত্র।
এছাড়াও অনলাইন ওয়ার্কপ্লেসে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আপওয়ার্ক কিংবা অন্যান্য ফ্রিল্যান্সিং সাইটে এসব কাজের সন্ধান হরহামেশাই মেলে ।

কোথায় পড়বেন :

বাংলাদেশে GIS এ স্নাতক না থাকলেও মাস্টার্স ও ডিপ্লোমা লেভেলে GIS কোর্স বিদ্যমান। মাস্টার্স লেভেলে ভর্তি হতে হলে যে কোন বিষয়ে স্নাতক থাকতে হবে। মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি(MIST), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, বুয়েট-জাপান ইন্সটিটিউট অব ডিসাস্টার প্রিভেনশন এন্ড আরবান সেইফটি(BUET-JIDPUS) থেকে GIS এর উপর কোর্স করানো হয় । এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জিও-প্ল্যানিং ফর এডভ্যান্সড ডেভেলপমেন্ট(GPAD) ট্রেনিং সেন্টার, বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভ্যান্সড স্টাডিজে GIS কোর্স করানো হয়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ ১৯৯২ সালে জিআইএস ল্যাবরেটরি গড়ে তোলে। এর পরের বছর আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় জিআইএস ল্যাবরেটরি স্থাপন করে। এগুলি হচ্ছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ পঠন বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগ। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে জিআইএস ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে । সর্বশেষ জিআইএস নিয়ে প্রচলিত একটি উক্তি দিয়ে লেখার ইতি টানতে চাই  

If a picture tells a thousand words, a map tells a thousand pictures.”  

  • মাহমুদুল হাসান সবুজ

– খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

email:[email protected]