পরিবেশের ক্রমাবনতি — মানুষই কি দায়ী? (৩)

পরিবেশের ক্রমাবনতি — মানুষই কি দায়ী? (৩)

অস্ট্রেলিয়ায় তখন মারসুপিয়াল বা অঙ্কগর্ভ প্রাণীদের রাজত্ব। এরা সামান্য সময় গর্ভধারণ করে অপুষ্ট ভ্রুণ প্রসব করে। শাবকগুলি মায়ের পেটে ঝোলানো থলিতে থেকে স্তন্যপান করে অবশেষে পরিণত অবস্থায় বেরিয়ে আসে। ক্যাঙ্গারু ও ওপোসাম এই গোত্রের প্রাণী। এছাড়া আছে প্লাটিপাসের মতো মনোট্রিম বা স্তন্যপায়ী অণ্ডজ প্রাণীরা। এইসব অপরিচিত প্রাণী শুধু বিস্ময়কর নয়, সে সময় ছিল বিপজ্জনকও। কারণ সেদিন তাদের আকারও ছিল বিশাল। ছিল দু’মিটার উঁচু দুশো কিলোগ্রাম ওজনের ক্যাঙ্গারু, আজকের বাঘের মাপে ভয়ংকর অঙ্কগর্ভ সিংহ, উটপাখির চেয়ে বড় উড়ানহীন পাখি আর পাঁচ মিটার লম্বা ড্রাগন হেন সরীসৃপ ও নানা সাপ। ডাইপ্রোটোডন ছিল বৃহত্তম অঙ্কগর্ভ, আকারে জলহস্তী সমতূল— দৈর্ঘ্যে তিন মিটার, উচ্চতায় দু’ মিটার আর ওজনে ২,৭৯০ কিলোগ্রাম।

আশ্চর্যের বিষয় হল, মানুষের সংস্পর্শে আসার দু-তিন হাজার বছরের মধ্যে এসব অতিকায় প্রাণী কর্পুরের মত ঊবে গেল। আজ তাদের অস্তিত্বের প্রমাণরূপে রয়ে গেছে শুধু কিছু জীবাশ্ম। এমনটা কিন্তু এশিয়া বা আফ্রিকায় ঘটেনি। এর কারণ কী?

অনেক গবেষকের বক্তব্য, এব্যাপারে মানুষের তেমন ভূমিকা নেই। প্রধান কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। কিন্তু মানুষকে বেকসুর খালাস দেওয়া যায় কি? মানুষের বিপক্ষে তিনটি প্রমাণ উল্লেখযোগ্য।

প্রথমতঃ, ৪৫,০০০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় তেমন জোরালো কোনো প্রাকৃতিক টালমাটাল ঘটেনি যার ফল এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আবহাওয়া বিপর্যয়ের মধ্যে আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল হিমযুগ, যা মোটামুটি একলক্ষ বছর অন্তর আসে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। মজার কথা হল, ডাইপ্রোটোডন পনের লক্ষ বছর ডজনের ওপর হিমযুগ টিঁকে থেকেও অকস্মাৎ শেষ হিমযুগটা সামলে উঠতে পারল না, যেটা ছিল তুলনায় যথেষ্টই কমজোরি।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে স্থলচর ও জলচর দু’ধরণের প্রাণীর বিলুপ্তির সম্ভাবনা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার স্থলচর প্রাণীদের ব্যাপক বিলুপ্তি ঘটলেও সমীপবর্তী সামুদ্রিক জীবেরা বিপন্ন হয়নি। আর মানুষ যেহেতু মূলত স্থলচর, তার আগমন স্থলচর জীবদের প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক।

তৃতীয়তঃ, অস্ট্রেলিয়ার এই ঘটানাক্রম মোটেই তুলনারহিত নয়। বরং, মানুষের কোন নতুন অঞ্চলে প্রথম পদার্পণ, এবং তার অব্যবহিত পরই সেই অঞ্চলের প্রাণীকুলের বিরাট অংশের বিলুপ্তি — এই ঘটনাক্রমের বিভিন্ন স্থান ও কালে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এতবার ঘটেছে যে তাকে আর সমাপতন বলা চলে না। যেমন, নিউজিল্যান্ডের অতিকায় প্রাণীরা ৪৫,০০০ বছর আগেকার ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ কাটিয়ে দিব্যি টিঁকে ছিল। মাত্র ৮০০ বছর আগে মাওরিদের পদার্পণ ঘটল, আর তার শ’দুয়েক বছরের মধ্যে সবাই নিশ্চিহ্ন, মায় অর্ধেকের বেশি পক্ষীপ্রজাতি!

আরেকটি তুলনীয় থটনা সুমেরু সহাসাগরে র‌্যাঙ্গেল দ্বীপের ম্যামথ বা অতিগজদের অবলুপ্তি। দশ হাজার বছর আগে আর সব জায়গায় নিশ্চিহ্ন হয়েও এই দ্বীপে তারা দিব্যি দাপিয়ে বেড়াত। কাল হল চার হাজার বছর আগে দ্বীপে মানুষের অবতরণ। ঢোখের নিমেষে নিশ্চিহ্ন হল অতিগজেরা।

দুটি অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক ঘটনায় মানুষ হাতেনাতে দোষী প্রমাণিত। দুটি ক্ষেত্রেই বিলুপ্ত প্রাণীটি পক্ষীগোত্রীয়।

মাদাগাস্কারের অধিবাসী গজপক্ষী বা এলিফ্যান্ট বার্ড ছিল উটপাখি, এমু বা কিউইর মত র‌্যাটাইট শ্রেণীর উড়ানহীন পাখি। সর্বকালের বৃহত্তম পাখি — উচ্চতা তিন মিটারের বেশি, ওজন ৭৩০ কিলোগ্রাম। মরিশাসের ডোডো পাখি তো আজ প্রবাদপ্রতিম। এই দুটি পাখিই মানুষ শিকার করে শেষ করেছে ৩০০-৩৫০ বছর আগে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে আমেরিকা ভূখণ্ডে মানুষের পদার্পণ প্রসঙ্গে।

প্রধান তথ্যসূত্র অবশ্যই ইউভাল নোয়া হারারি’র সাপিয়েন্স। এছাড়া D. J. Mulvaney-র The Prehistory of Australia।