হৃদ হাসানের একগুচ্ছ কাব্য

বৈরাগী

বিচ্ছেদ
___________

কোন এক অবসরে,
অবসাদে আক্রান্ত তারা’রা যখন মিটিমিটি জ্বলে- ঝরে।
দক্ষিণা বাতাসে তখন পূর্ণিমার চাঁদ মিথ্যে মনে হয়।
আর ভাবনারা ডানা মেলে স্মৃতির পাতা ফেলে,
কতো শত রঙিন স্বপ্ন আঁকা ছিলো সেই সময়ে!
তখন আমিও ছিলাম নির্ভাবনায় তোকে ঘিরে।

মনে পড়ে,
সেদিন বৃষ্টি ঝরেছিল গহীন বনে- নিঃশব্দে।
যেখানে সূর্য্যি কিরণ পৌঁছাতে সময় লাগে হাজার বছর,
সেখানে আমার তীব্র হাহাকার হারিয়ে যায় পাখির করতালে।

সেখানে-
কোন এক শীতের ঝরা পাতায় লিখে রেখেছিলাম হাজার কথা।
সেই থেকে ইচ্ছে শক্তি খুন করে বেঁচে আছি।
সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে হুংকার ছেড়েছি,
আবার কখনো চুপ করে থেকেছি বোবাদের মতো।
হাসা হয়নি আর প্রাণ খুলে, বলা হয়নি কিছু,
একসাথে আর হাঁটা হয়নি মরুভূমির পিছু।

 

 

কদম বিহীন এক বরষা
_______________________

কখনো ভাবিনি এমনও দিন আসবে,
বৃষ্টি হবে মাতাল ধারায়,
কদম ফুটবে,
অথচ সেই বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের কদম ছোঁয়া হবে না।

তুমি বলেছিলে,জীবন কখনো পরিকল্পনা মাফিক চলে না।
তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ এই বরষা।
কে ভেবেছিলো, এমন উদ্যম বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে কাটাতে হবে অলস মুহুর্ত ?

শত অভিযোগ ভাসিয়ে দেয়ার মোক্ষম সময় আষাঢ়-শ্রাবন।
হাতে হাত রেখে ভিজে যাওয়া এমন বৃষ্টিতে ভালোবাসা ডানা মেলে আকাশে।
অথবা শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, নদীর ধারে,
প্রিয় ক্যাম্পসের বদ্ধ গন্ডিতে, চায়ের টংয়ে,
বা খোলা রিক্সায়, একসাথে ভিজে যাওয়া।

তারুণ্যের পায়ে দাড় করানো স্বপ্ন ভেঙে যায় যৌবনভারে।
তারপরও হাল না ছেড়ে আমার নৌকায় পাল ধরা তুমি স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে।
আজ অথবা কাল, কাল না হলে পরশু
তোমার সীমাহীন আপোষের সাথে কেটে যেতে থাকলো জীবন- সংসার।

আজকাল তোমাকে খুব মনে পড়ে।
তোমার খুব ইচ্ছে ছিলো, কদম খোপায় নীল শাড়িতে একদিন ভিজে যাবে এই বৃষ্টিতে।
অথচ জৈবিক বৈচিত্রে তোমার অপেক্ষার তালিকা শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘই হলো,
আক্ষেপ গুছল না।

এখন যখন পূর্ণ মুহুর্ত আমার হাতে,
পাশে বসে এককাপ চা খাওয়ার জন্যে তুমি নেই।
আজ যখন আলমারি থেকে তোমার গুছিয়ে রাখা নীল শাড়িটা বের করে হাতে নিলাম,
হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় কেপে উঠলো আমার বৃষ্টিস্নাত কদম বৃক্ষ।

কদম বৃক্ষ? না তার সামনে শায়িত তুমি?

 

 

চোখ খুলে দেখ

———————–

এক রুদ্ধদার বৈঠক হয়ে গেল।
তর্কে তর্কে জানা গেল গোপন সব কথা।
তার প্রতিটি বাক্যেই ছিল আমার অপারগতা।
সে সত্য,
তার বিষণ্ণতা সত্যি,
তার কান্না অযাচিত নয়,
তার আহাজারি অবাস্তব নয়,
সে আজ সত্যিই একা।
এমন জীবন তো সে চায় নি!
এমন একাকীত্বও তো সে চায় নি!

দু বছর আগে যখন আমার হাত ধরে ঘর ছেড়েছিল, তখনই বলে দিয়েছিল তার চাহিদার কথা।
তালিকায় ছিল দু’মুঠো ভাত আর একটু বেশিই ভালোবাসা।
আমিও রাজি ছিলাম সে সময়।
তবে আজ কেন এই আসামির কাঠগড়ায়?

ব্যস্ততা আমাকে ভিষণ ভাবে গ্রাস করেছিল তখন,
তার ভালোবাসার চেয়েও বাস্তব সত্য আমাকে ভাবিয়ে দিয়েছিল অনেক।
তার সুখ,
আমার সুখ,
আমাদের সুখ,
ভুলে গিয়ে আমি ডুবে ছিলাম টাকা ছাপানোর চিন্তায়।
ভেবেছিলাম, “টাকাই তো সুখ কিনে দিবে”!
কিন্তু এ আর হলো কই?
বেতন সব মিলিয়ে ২৫ হাজার টাকা আর স্বপ্ন ছিল লাখ বা কোটির।
তার ভবিষ্যৎ,
আমার ভবিষৎ,
আমাদের ভবিষ্যৎ,
অনাগতদের ভবিষ্যৎ,
সব মিলিয়ে আমি ভালোবাসতে ভুলে গিয়েছিলাম।
হয়তো ভুলি নি সম্পুর্ণভাবে এখনো,
কিন্তু এখন আর সে এইসব বিশ্বাস করে না।
এখন তার কাছে সবই অজুহাত,
এখন তার কাছে আমি মিথ্যে,
এখন তার কাছে আমিই প্রতারক!

একটু পর মাননীয় বিচারক আমাদের ফয়সালা করে দিবেন।
আর একটু পর আমরা আলাদা হয়ে যাবো চিরোদিনের জন্যে।
আর একটু পর হয়তো….

থাক,
বাকী সব কথা পরে হবে,
আমার মৃত এ চিঠি যখন পৌঁছে যাবে তোমার হাতে,
তুমি চোখ খুলে দেখ,

 

 

হৃদ হাসান
কবি ও নাট্যশিল্পী
একদল ফিনিক্স