পরিবেশের ক্রমাবনতি — মানুষই কি দায়ী? (৪)

 

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আশা করি একথা স্পষ্ট হয়েছে যে অস্ট্রেলিয়া ভূখণ্ডে পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য মানুষকে দোষী ভাবার যথেষ্ট কারণ বর্তমান। এই বিপর্যয়ে প্রাণী ও উদ্ভিদের অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছিল এবং ফলত খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু এই বিরাট বিপর্যয় ঘটল কীভাবে। নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও তিনটি সম্ভাবনার কথা মাথায় আসে, যার একটি, দুটি বা হয়ত তিনটিই বাস্তবে ঘটেছিল।
অতিকায় জীবপ্রজাতিগুলির কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল নিম্ন প্রজননহার, দীর্ঘ গর্ভধারণকাল ও প্রসব প্রতি ন্যুনতম শাবকসংখ্যা। এর ফলে একটিমাত্র পশুর — বিশেষত স্ত্রী-পশুর মৃত্যু পুরো প্রজাতির জনসংখ্যার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। যদি কয়েক মাস অন্তর একটি করেও পশু মারা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুহার জন্মহারকে ছাপিয়ে যাবে — জনসংখ্যাতত্বের নিয়মে
যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি প্রজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।
পরের প্রশ্ন, প্রস্তরযুগের প্রকৌশল নিয়ে ক্ষীণবল মানুষ কীভাবে এই দৈত্যাকার প্রাণীদের হত্যা করতে সক্ষম হত? আসলে তার প্রধান অস্ত্র ছিল চমক। কুড়ি লক্ষ বছর ধরে এশিয়া ও আফ্রিকায় আদি মানুষ, অর্থাৎ হোমো সাপিয়েন্স এর পূর্বপুরুষেরা বিশাল জন্তুদের পিকার করে এসেছে। সময়ের সঙ্গে শিকারীর কৌশল যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনই শিকারও পিখেছে পলায়নের কৌশল।

অস্ট্রেলিয়ায় কিন্তু দৈত্যাকার পশুরা প্রথম সাক্ষাতে মানুষকে বিপজ্জনক বলে বুঝতেই পারে নি। যখন বুঝতে পারল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, মানুষ ইতিমধ্যে আগুনকে পোষ মানিয়েছে। আগুন যেমন পশুদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে তেমনি সাহায্য করেছে বৃক্ষাকীর্ণ অরণ্যকে পুড়িয়ে উন্মুক্ত তৃণভূমিতে পরিণত করতে। এভাবে পশুরা তাদের স্বাভাবিক বাসভূমি ও খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে খাদ্যশৃঙ্খল। অন্য অনেক গাছ নিশ্চিহ্ন হলেও ইউক্যালিপটাস গাছের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, কারণ এই গাছ বিশেষভাবে অগ্নিসহ। আবার কোআলা, যাদের একমাত্র খাদ্য ইউক্যালিপটাস পাতা, তারা বেঁচে গেল।

তবে আবহাওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। বরং মনে হয় মানুষের অভিযান যাদের খাদের কিনারায় এনে ফেলেছিল প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদের শেষ ধাক্কাটা দেয়।
হয়ত সবগুলি কারণ সমান্তরালভাবে সক্রিয় ছিল। যাই হোক, এমনটা কিন্তু আফ্রিকা ও এশিয়ায় ঘটেনি। মূল পার্থক্য আকস্মিকতা।
পরবর্তী কিস্তিতে আলোচনা করব আমেরিকা ভূখণ্ডে মানুষের পদার্পণ এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর তার চিরস্থায়ী প্রভাব।

প্রধান তথ্যসূত্র অবশ্যই ইউভাল নোয়া হারারি’র সাপিয়েন্স। এছাড়া D. J. Mulvaney-র The Prehistory of Australia।

 

📝ফারজানা বৃষ্টি