চীন – ভারত সীমান্ত উদ্বেগ: বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জটিলতা

চীন – ভারত সীমান্ত উদ্বেগ: বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জটিলতা-

চীন- ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ আমাদের দেশকে প্রভাবিত করে শুধু প্রতিবেশি দেশ হিসেবে যতটুকু না তারচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক দিক থেকে। যদি কতদিন আগে পেঁয়াজের দামের কথা বলি বা বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে চীনা পন্যের দামের দিকে দেখি , যেমন এলাচির দামের প্রসঙ্গে যাই তাহলেই বোঝা যায় এ দুটো দেশ কতটা প্রভাবিত করে আমাদের বাজারকে। বেশি আমদানি নির্ভর বা বিকল্প বাজার না থাকলে আমদানিকৃত দ্রব্যের দাম এভাবে বাড়িয়ে দিলে
বেশি টাকা দিয়ে ক্রয় করা ছাড়া ক্রেতার আর কোন উপায় থাকে না । মাঝেমাঝে যে দেশ রপ্তানি করছে সেটি বাজার দখল করতে প্রথমে কম দামে বিক্রি করে দেশীয় কৃষকদের নিরুসাহিত করে উৎপাদনে, পরবর্তীতে দাম বাড়ায় ইচ্ছে করেই বাজার দখল করার পর। ইচ্ছাকৃতভাবেও বাড়ায় আবার উৎপাদন কমে গেলে যেমন- কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্যও বাড়ায়। এখন যেমন কোভিড-১৯ এর জন্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না, উৎপাদন হচ্ছে না আগের মত।

বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে চীন থেকে, মোট আমদানির ২৫%, তারপর ভারত থেকে। তাই দুটি দেশই বাণিজ্যিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বরাবরই বেশি। এটা কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে চীন অনেক পণ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দিচ্ছে বলে বিকল্প বাজার হিসেবে চীনকে নিয়েছে তুলনামূলক সুবিধা পেয়েছে তাই । চীন বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে।প্রযুক্তিগত দিক থেকেও চীন ভারত থেকে অনেকটা এগিয়ে। ফলে যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে, ৮০-৮৫% যন্ত্রাংশ এদেশে চীন থেকেই আসে।
ভারতের চিত্র থেকে ব্যতিক্রম হলো চীন শুধু বাংলাদেশে রপ্তানি করছে না, আমদানিও করছে ব্যাপক হারে নিজ দেশে। বাংলাদেশের কাঁকড়া, মাছ, কুচে এসব রপ্তানির ৯০ভাগই আমদানি করছে চীন। আর আমরা আমদানি করছি ভোগ্যপণ্যসহ আরো অনেক ধরনের পণ্যের কাঁচামাল, তৈরিকৃত দ্রব্য। বেশিরভাগ মসলা যেমন- রসুন, আদা, ডাল, লবঙ্গ, এলাচি, দারুচিনি ইত্যাদি চীন থেকেই আমদানি করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পে এগিয়ে রয়েছে, ২০১৮সাল ” ওষুধ বর্ষ” ঘোষিত হয় এজন্য। বর্তমানে প্রায় ১৫০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। দেশের ওষুধের চাহিদা ৯৮ ভাগ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করছে এতগুলো দেশে তা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গর্বের। বর্তমানে ব্যাপকহারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে আমাদের ওষুধ শিল্প।

বর্তমানে বিশ্ব ওষুধ এর চাহিদা অনেক। ভারত ওষুধ রপ্তানি স্থগিত করেছে ওষুধের সংকট দেখা দিতে পারে এমন সংশয় থেকে । ভারত চীন থেকে পণ্য আমদানি করছে না। ভারতের ওষুধ তৈরির কাঁচামাল ৭০ – ৮০ ভাগই আমদানি করে চীন থেকে। ভারতের ওষুধের বাজার বাংলাদেশ দখল করতে পারে।
যেসব দ্রব্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে সেসব খাতে নজর দিয়ে কঠোর নীতি প্রণয়ন করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। শুধু প্রণোদনা বা ভর্তুকি যে সমাধান নয় তা কৃষি খাতের দিকে তাকালে বুঝা যায়। সরকার প্রতিবছর কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে কিন্তু সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের এ খাতটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। তাই অনেক কৃষি পন্য আমদানি করতে হচ্ছে।
তাছাড়া উর্ধ্বমুখী দামের লাগাম ধরতে বাংলাদেশকে বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে হবে। যেমনটা করেছে ভিয়েতনাম, পোশাক রপ্তানি তে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ স্থান দখল করেছে চীনকে টপকে , চীনের প্রতিবেশি দেশ হয়েও করোনা মুক্ত ঘোষণা করতে পেরেছে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ভিয়েতনামের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়টা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের কাছাকাছি সময় ই, ভিয়েতনাম ১৯৭৬ থেকে শুরু এবং ১৯৮৬ নতুন নতুন নীতি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে মোড় নেয় উন্নতির দিকে। ভিয়েতনামকে আমরা আদর্শ হিসেবে নিতে পারি।

চীন – ভারত দুটি দেশই বিশ্বে অন্যতম পারমাণবিক ও সামরিক ক্ষমতাধর দেশ। ফলে দুই দেশের যুদ্ধ সংঘটিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যাতে বৃহৎ কোন ধাক্কা না লাগে এমন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নীতি প্রণয়ন করা উচিত। যেহেতু বিশ্বজুড়েই এখন প্রতিকূল অবস্থা বিরাজমান।

 

লিখেছেনঃ

তানিয়া সুলতানা
সাবেক শিক্ষার্থী
অর্থনীতি বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়