কোভিড-১৯ এ আত্মরক্ষার জন্য যে উপকরণগুলো অত্যাবশ্যকীয়, ভবিষ্যতে তা হয়ে উঠবে বিপদের কারণ

 

পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারীর ঘটনা ঘটেছে এবং এসব মহামারীতে মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। এসব মহামারীতে প্লেগ আর ফ্লুর নামই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, নানা কারণে একটি ছোট অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটা রোগ ছড়িয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।ইতিহাসে অর্ধশতাধিক মহামারীর লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মহামারীগুলোতে মানব জাতি বিভিন্ন সময়ে বড় সংকটে পড়েছিল।বর্তমান সময়ে সারা বিশ্ব জুড়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে এই করোনা ভাইরাস। কবে এই করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলবে বা আদৌ মিলবে কিনা তাও সবারই অজানা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে পৃথিবী থেকে নভেল করোনাভাইরাস ‘হয়তো কখনোই নির্মূল হবে না।’বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ববিদ মারিয়া ভ্যান কারখোভ ব্রিফিংয়ে বলেন: এই মহামারি পরিস্থিতি থেকে বের হতে আমাদের সময় লাগবে, আমাদের মানসিকভাবে এর জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত।এখন আসা যাক মূল কথায়, এই করোনাকালে ফেলে দেওয়া ব্যবহারিত মাস্ক,গ্লাভস বা মেডিকেলের বর্জ্য এক নতুন হুমকি হিসেবে মানুষ ও জলজ প্রাণির জন্য দেখা দিয়েছে।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজারসহ নানা ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই এগুলোর চাহিদাও বহুগুণ বেড়ে গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে মাস্ক পরলে ‘জীবাণু বহনকারী ড্রপলেট’ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে নতুন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। এখন চিন্তার বিষয় হলো এই যে, আমরা এসব ব্যবহৃত মাস্ক বা গ্লাভস কোথায় ফেলছি বা যথাযথভাবে তা ডামপিং করছি কিনা।ইদানিং রাস্তার আশেপাশে ডাস্টবিনে দেখা যায় মাস্ক, গ্লাভস পড়ে আছে অসংখ্য।এমনকি যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতেও দেখা যায়।করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঘরে ঘরে যে মাস্ক-গ্লাভস ব্যবহার করা হচ্ছে, যথাযথ পদ্ধতিতে নষ্ট না করলে তা পরিবেশ দূষণ ঘটাতে পারে।আত্মরক্ষার জন্য যে উপকরণগুলো অত্যাবশ্যকীয়, ভবিষ্যতে তা হয়ে উঠবে বিপদের কারণ। বিশেষ করে পলিভিনাইলের প্রয়োগে তৈরি দীর্ঘমেয়াদি মাস্ক এবং নাইট্রাইল ও ভিনাইল গ্লাভস। ইতিমধ্যেই অনেক দেশের বড় শহরেই মাস্ক ও গ্লাভস দূষণ দেখা দিতে শুরু করেছে।বাংলাদেশ জনসংখ্যাবহুল দেশ হওয়াতে এই মাস্কও গ্লাভস দূষণ দিন দিন চরম আকার ধারণ করেছে।তার সাথে আরেকটা নতুন বিষয় বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তা হলো ১৩ জুলাই ২০২০ বিভিন্ন পত্রিকা এবং টিভির সংবাদে প্রকাশিত হয় যে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ব্যাপক হারে ভেসে আসছে প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এর সঙ্গে ভেসে আসছে কাছিম, সাপসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে মদের খালি বোতল, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসের পরিত্যক্ত বর্জ্যসামগ্রী এবং জাহাজে ব্যবহারের জালসহ নানা সামগ্রী। যা জলজ প্রাণির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক মৃত কাছিমও ভেসে আসছে। তার মূল কারণ হতে পারে পানিতে বিষাক্ত কোন রাসায়নিকের উপস্থিতি এবং পানিতে দ্রবনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে। সিগারেটের শেষাংশ, ঠান্ডা পানীয়র স্ট্র এবং প্লাস্টিকের প্যাকেট সারা বিশ্বে দূষণের অন্যতম বড় কারণ। এ বার কি সেই ভূমিকা নিতে চলেছে করোনা ঠেকানোর মাস্ক ও গ্লাভস?এখন তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা তাহলে কি করব? হ্যাঁ অবশ্যই সমাধান আছে, সুতির মাস্ক পরিবেশের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ। তবে নানা ধরনের প্লাস্টিকের সকেট দেওয়া যে মাস্কের বিক্রি এখন বেড়েছে, তার অনেকগুলোতেই পলিপ্রোপিলিন থাকে। এই রাসায়নিক যৌগ পরিবেশে মিশতে সময় লাগে।যে ভাবে বায়ো মেডিক্যাল বর্জ্য আলাদা করে বিশেষ উপায়ে নষ্ট করা হয়, মাস্ক ও গ্লাভসের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনই করা উচিত। না হলে পরিবেশের ক্ষতি হবে।’অতি উচ্চ তাপমাত্রায় এই সামগ্রীগুলো নষ্ট করা উচিত। বাড়িতে ব্যবহারের পর মাস্ক ও গ্লাভস ব্লিচিং পাউডার বা সাবান জলে ধুয়ে আলাদা করে রাখা উচিত।’পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, মাস্কের পাশাপাশি যে নাইট্রাইল ও ভিনাইল গ্লাভস ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোও পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব নয়। এই জাতীয় গ্লাভসের মাটিতে মিশতে অন্তত দু’বছর সময় লাগে। তাই তা পুকুর বা ড্রেনে ফেলা উচিত নয়।এই সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে এবং সবাই সচেতন হয়ে চললে মানবজাতি যেমন নিরাপদে থাকতে পারবে, তেমনি নিরাপদে থাকতে পারবে অন্যান্য প্রাণিকূলও।

 

লেখকঃ
মোঃ শাকির আহম্মেদ
পরিবেশ বিজ্ঞান ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।